ফিরোজ আল আমিন
নিজস্ব প্রতিনিধি:
সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজে পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষার্থীকে গুলি করার বহুল আলোচিত ঘটনায় কলেজের সাবেক প্রভাষক ডা. রায়হান শরীফকে অস্ত্র আইনের দুটি ধারায় মোট ২১ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে অর্থদণ্ডও প্রদান করা হয়েছে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।
সোমবার (১৮ মে) দুপুরে সিরাজগঞ্জের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক জেলা ও দায়রা জজ ইকবাল হোসেন আসামির উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) রফিক সরকার।
আদালত সূত্রে জানা যায়, দণ্ডপ্রাপ্ত ডা. রায়হান শরীফ সিরাজগঞ্জ শহীদ এম মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি সিরাজগঞ্জ শহরের দত্তবাড়ী মহল্লার বাসিন্দা এবং সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে। আলোচিত ঘটনার পর স্বাস্থ্য বিভাগ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে।
মামলার নথি ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ মার্চ শহীদ এম মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজের একাডেমিক ভবনের চতুর্থ তলায় শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা চলছিল। ওই পরীক্ষার দায়িত্বে ছিলেন প্রভাষক ডা. রায়হান শরীফ। অভিযোগ রয়েছে, পরীক্ষা কক্ষে শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে তিনি সঙ্গে করে আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করেন।
একপর্যায়ে তার বহন করা ব্যাগ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল বের করেন তিনি। পরে হঠাৎ করেই শিক্ষার্থী আরাফাত আমিন তমালকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। গুলিটি তমালের ডান পায়ে বিদ্ধ হলে তিনি গুরুতর আহত হন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত অন্যান্য শিক্ষার্থী আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং কলেজজুড়ে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
আহত শিক্ষার্থী আরাফাত আমিন তমাল বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার ধামাচাপা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি আব্দুল্লাহ আল আমিনের ছেলে এবং ওই মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সহপাঠীরা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
ঘটনার পর ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ডা. রায়হান শরীফকে পরীক্ষার কক্ষের ভেতরে অবরুদ্ধ করে রাখেন এবং পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে আটক করে। এ সময় তার কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, গুলি, ম্যাগাজিন, বিদেশি ছোরা ও চাকু উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র।
ঘটনার পর সিরাজগঞ্জ ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) ওয়াদুদ আলী অস্ত্র আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। এছাড়া গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থী তমালের বাবা আব্দুল্লাহ আল আমিন বাদী হয়ে পৃথক আরেকটি মামলা করেন। মামলাগুলো তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে দাবি করে, অভিযুক্ত প্রভাষক অবৈধভাবে আগ্নেয়াস্ত্র বহন এবং ব্যবহার করেছেন, যা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো সংবেদনশীল পরিবেশে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করেছে। মামলায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দির ভিত্তিতে আদালত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন।
পিপি রফিক সরকার জানান, আদালত অস্ত্র আইনের দুটি ধারায় ডা. রায়হান শরীফকে মোট ২১ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছেন। একই সঙ্গে তার হাজতবাসের সময়কাল দণ্ডের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। তিনি বলেন, “এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ছিল। আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে এ রায় দিয়েছেন।”
এদিকে রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও আইনজীবীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা দেখা যায়। অনেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্ত্র বহনের মতো ঘটনায় কঠোর শাস্তির রায়কে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। শিক্ষার্থীদের একটি অংশও এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে।
উল্লেখ্য, ঘটনার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা ও শিক্ষকদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর ঘটনাটির তদন্ত শুরু করে এবং অভিযুক্ত প্রভাষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করা হলো। আদালতের এ রায়ের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্ত্রের ব্যবহার ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন