আশরাফুল ইসলাম রনজু, তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি
রাজশাহীর তানোর উপজেলায় কর্মরত অধিকাংশ সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়মিতভাবে জেলা শহর রাজশাহী থেকে যাতায়াত করেই অফিস করছেন। স্থানীয়ভাবে বসবাস না করায় উপজেলার সার্বিক অর্থনীতি, সেবা খাত এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তানোরে কর্মরত বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, চিকিৎসক-নার্স এবং জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই রাজশাহী শহরে বসবাস করেন। তারা প্রতিদিন সকালে ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে কর্মস্থলে উপস্থিত হয়ে অফিস কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং বিকেল ৩টা থেকে ৫টার মধ্যে পুনরায় রাজশাহীতে ফিরে যান।
উপজেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সরকারি আবাসিক ভবন থাকলেও সেখানে কেউ থাকছেন না বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। দীর্ঘদিন অনাবাসিত থাকায় এসব কোয়ার্টারের অনেক ভবনই জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে এবং কিছু ভবন বসবাসের অযোগ্য অবস্থায় পৌঁছেছে।
স্থানীয়দের মতে, সরকারি সম্পদের এই অব্যবহার যেমন অর্থনৈতিক অপচয় ঘটাচ্ছে, তেমনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যকারিতাও কমিয়ে দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কোনো অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবাহ স্থানীয়ভাবে আবর্তিত না হলে সেই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন পিছিয়ে পড়ে। তানোরের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আয়ের বড় অংশ রাজশাহী শহরে ব্যয় হওয়ায় স্থানীয় বাজার, দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিতভাবে বিকশিত হচ্ছে না। এমনকি নতুন বড় বিপণিবিতান বা বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে ওঠার গতিও থমকে আছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অধিকাংশ শিক্ষক-চিকিৎসক শহর থেকে যাতায়াত করায় তারা কর্মস্থলে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে পারেন না। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবার মানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
ফলে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কাঙ্ক্ষিত মান অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে। একইভাবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে স্থানীয়রা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, উপজেলা সদর ও থানা মোড় এলাকায় প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে রাজশাহী থেকে আসা বাসে যাত্রী ওঠানামার সময় চরম ভোগান্তি দেখা দেয়।
অনেক সময় আসন নিশ্চিত করতে যাত্রীদের মধ্যে হুড়োহুড়ির ঘটনাও ঘটে, যা স্থানীয়দের কাছে প্রতিদিনের স্বাভাবিক দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়া তানোর উপজেলা গেট থেকে বুরুজ ব্রিজ হয়ে মোহনপুর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দীর্ঘদিন ধরে প্রশস্তকরণ না হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, তানোরের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে কর্মকর্তাদের আবশ্যিকভাবে কর্মস্থল এলাকাতেই বসবাস নিশ্চিত করা জরুরি। এতে যেমন সরকারি আবাসন ব্যবহার হবে, তেমনি স্থানীয় অর্থনীতি ও সেবা খাতেও গতি আসবে।
তাদের মতে, কর্মস্থলে অবস্থান বাধ্যতামূলক করা না হলে তানোরের উন্নয়ন আরও পিছিয়ে পড়বে এবং সরকারি বিনিয়োগের সুফল সাধারণ মানুষ পুরোপুরি পাবে না।