পলাশ পাল, জেলা প্রতিনিধি
নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলাকে ময়মনসিংহ বিভাগ তথা দেশের অন্যতম উন্নত ও আধুনিক জনপদ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি বলেছেন, অবহেলিত সীমান্ত জনপদ দুর্গাপুর-কলমাকান্দাকে কৃষি, যোগাযোগ, পর্যটন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সমন্বয়ে একটি “উন্নয়নের মডেল” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে।
শুক্রবার (১৫ মে) বিকেলে দুর্গাপুর উপজেলার কুল্লাগড়া ইউনিয়নে চলমান খাল খনন প্রকল্পের কাজ সরেজমিন পরিদর্শনকালে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনকালে ডেপুটি স্পিকার কুল্লাগড়া ইউনিয়নের মাদুপাড়া বার্নাট কুবির বাড়ির নিকটবর্তী পাহাড়ি ছড়া থেকে সিএমবি ব্রিজ হয়ে খুজিপাড়া এবং নেথপাড়া পঁচা খালের ব্রিজ অতিক্রম করে চিনাকুড়ি বিল পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৬শ’ মিটার খাল খনন কাজের অগ্রগতি ঘুরে দেখেন। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের ইজিপিপি প্রকল্পের আওতায় এই খনন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
খাল খননের গুরুত্ব তুলে ধরে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, “এটি শুধু একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি এ অঞ্চলের কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনের একটি বড় উদ্যোগ। খালটি পুনঃখনন হলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা কমবে, পানি দ্রুত নিষ্কাশন হবে এবং শুকনো মৌসুমে কৃষকরা সহজে সেচ সুবিধা পাবেন। এর ফলে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।”
পরিদর্শনের একপর্যায়ে তিনি স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে দীর্ঘসময় কথা বলেন এবং তাদের জীবনমান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভূমি সংক্রান্ত নানা সমস্যার কথা শোনেন। আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার কথা উল্লেখ করে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “এ অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী অত্যন্ত শান্তিপ্রিয় ও পরিশ্রমী। তারা আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এ অঞ্চলে তাদের বসবাস বহু পুরোনো হলেও রাষ্ট্রীয় নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা দীর্ঘদিন বঞ্চিত থেকেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম সপ্তাহেই আমি এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান সমস্যা সুপেয় পানির সংকট নিরসনে কাজ শুরু করেছি। ইতোমধ্যে ৫২০ ফুট গভীরতার ৪০টি সাবমার্সিবল টিউবওয়েল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যদিও চাহিদার তুলনায় এটি এখনও কম, তবে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি পাড়ায় বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।”
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে শিগগিরই বড় ধরনের সহায়তা কার্যক্রম হাতে নেওয়ার ঘোষণাও দেন ডেপুটি স্পিকার। তিনি জানান, দুর্গাপুরে ১০টি এবং কলমাকান্দায় ৯টি নতুন ঘর নির্মাণ করে আদিবাসী পরিবারের মাঝে হস্তান্তর করা হবে। এছাড়া নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে ৩৯টি উন্নতমানের সেলাই মেশিন এবং শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের যাতায়াত সহজ করতে ৪৮টি বাইসাইকেল বিতরণ করা হবে।
দুর্গাপুরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি বলেন, “সোমেশ্বরী নদী, পাহাড়ি ছড়া ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে পর্যটন উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনার আওতায় খালের দুই পাশে পিচঢালা সড়ক নির্মাণ, আধুনিক ব্রিজ ও সৌন্দর্যবর্ধনমূলক কাজ করা হবে। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটক এসে স্থানীয় আদিবাসীদের তৈরি তাঁতপণ্য ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবেন।”
তিনি আরও বলেন, আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের ভূমি ব্যবস্থাপনা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদলে একটি বিশেষ কাঠামো বা পৃথক বিভাগ গঠনের বিষয়টি নিয়েও সরকারিভাবে চিন্তাভাবনা চলছে।
নির্বাচিত হওয়ার মাত্র ৮৬ দিনের মাথায় একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পারায় সন্তোষ প্রকাশ করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, “নির্বাচনের আগে আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, দুর্গাপুর-কলমাকান্দার সাধারণ মানুষ ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করব। আজ সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আমি বলেছিলাম, দুর্গাপুর-কলমাকান্দা একটি বাগান, আর আমি সেই বাগানের মালি হতে চাই। জনগণের দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”
সীমান্ত সড়ক উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় একনেক বৈঠকে জলবায়ু সহনশীল পাঁচটি সেতু নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে, যার মধ্যে চারটিই দুর্গাপুর-কলমাকান্দা এলাকায় নির্মিত হবে। এসব সেতু নির্মিত হলে কুল্লাগড়া ইউনিয়নসহ নদী-পারের অনেক বিচ্ছিন্ন এলাকা সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় আসবে। এছাড়া বিরিশিরি, মহাদেও নদী ও লেংগুড়ার গণেশ্বরী নদীর ওপরও নতুন সংযোগ সেতু নির্মাণ করা হবে।
এলাকার সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, “আমি শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন নয়, মানুষের জীবনমানের সামগ্রিক পরিবর্তন চাই। ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতির ভিত্তিতে সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই। সকলের সহযোগিতা ও প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা আগামীর সুন্দর, আধুনিক ও সমৃদ্ধ দুর্গাপুর-কলমাকান্দা গড়ে তুলব।”
পরিদর্শনকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ সাদাত, দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।