মোখলেছুর রহমান ধনু
রামগতি-কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি
লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার ৮ নম্বর কাদিরা ইউনিয়নে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ কর্মসূচির আওতায় চলমান কাটাখালী খাল খনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, গাফিলতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, ভুল পরিকল্পনা ও দায়িত্বহীনতার কারণে খালটি এখনো ভুলুয়া নদীর সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়নি। ফলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে কয়েক হাজার মানুষ ভয়াবহ জলাবদ্ধতার আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইসলামগঞ্জ স্লুইস গেট থেকে ভুলুয়া নদী পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ কাটাখালী খালটি পুনঃখননের উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা দূর করা, কৃষিজমির পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করা এবং বর্ষা মৌসুমে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমানো। কিন্তু বাস্তবে খনন কাজের একাধিক অংশ অসম্পূর্ণ রেখেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) কাজ শেষ দেখানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, খালের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বিশেষ করে ভুলুয়া নদীর সঙ্গে সংযোগস্থল খনন না করায় পুরো প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বর্ষাকালে এই খাল দিয়ে পানি নদীতে প্রবাহিত হওয়ার কথা থাকলেও সংযোগ না থাকায় পানি নিষ্কাশন কার্যত বন্ধ হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
কাদিরা ইউনিয়নের বাসিন্দা আলী হোসেন বলেন,
“সরকার মানুষের উপকারের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করছে। কিন্তু যারা কাজ করছে তারা নিজেদের স্বার্থ দেখছে। খালের মুখ বন্ধ রেখে খনন করলে জনগণের কী লাভ হবে?”
স্থানীয় গৃহিণী মূরশিদা খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“নদী-খাল তো সরকারি সম্পদ। একজন ব্যক্তি কীভাবে নদীর সংযোগস্থল নিজের পৈত্রিক সম্পত্তি দাবি করে কাজ বন্ধ রাখে? প্রশাসন যদি সময়মতো ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে বর্ষায় আমাদের ঘরবাড়ি পানির নিচে চলে যাবে।”
এলাকার আরেক বাসিন্দা আলেয়া বেগম অভিযোগ করেন, মূল খাল খনন না করে উল্টো তার বসতঘর ভাঙার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন,
“যেখানে খনন দরকার সেখানে কাজ না করে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ির দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। এতে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।”
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের কাজে যথাযথ তদারকি না থাকায় খননের গভীরতা ও প্রশস্ততাও অনেক স্থানে নকশা অনুযায়ী হয়নি। কিছু অংশে নামমাত্র মাটি কেটে কাজ শেষ দেখানো হয়েছে বলেও দাবি স্থানীয়দের। এছাড়া একাংশ খনন না করেই বেকু মেশিন সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভাপতি সুফিয়া বেগমের স্বামী ছিদ্দিক উল্লাহ কাজ তদারকির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন,
“কাজটি আমি দেখভাল করছি। কিন্তু একজন ব্যক্তি তার রেকর্ডীয় জায়গার ওপর দিয়ে খাল নিতে বাধা দিচ্ছে। এ কারণে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।”
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, জমি জটিলতার বিষয়টি আগে থেকেই সমাধান না করে কাজ শুরু করায় এখন পুরো প্রকল্প অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। তারা মনে করছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

এ বিষয়ে কমলনগর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) পরিতোষ কুমার বিশ্বাস বলেন,
“খালের অল্প কিছু কাজ বাকি রয়েছে। সীমানা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলা সার্ভেয়ার পাঠিয়ে সীমানা নির্ধারণ করা হবে। এরপর দ্রুত শ্রমিক দিয়ে বাকি অংশ খনন কাজ সম্পন্ন করা হবে।”
তিনি আরও জানান, প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে প্রশাসন আন্তরিক রয়েছে এবং স্থানীয়দের ভোগান্তি এড়াতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে এলাকাবাসীর আশঙ্কা, খালের সঙ্গে ভুলুয়া নদীর সংযোগ স্থাপন না করা হলে বর্ষা মৌসুমে পুরো অঞ্চলে পানি জমে কৃষিজমি নষ্ট হবে, মাছের ঘের ও পুকুর তলিয়ে যাবে এবং হাজারো পরিবার দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতার কবলে পড়বে। বিশেষ করে নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে ডিজিটাল সার্ভের মাধ্যমে খালের সঠিক সীমানা নির্ধারণ, প্রকল্পের স্বচ্ছ তদন্ত এবং দ্রুত কাজ সম্পন্নের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, জনগণের টাকায় বাস্তবায়িত উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম হলে শুধু সরকারের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ন হয় না, সাধারণ মানুষও চরম ভোগান্তির শিকার হয়।
এলাকাবাসীর দাবি, বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই কাটাখালী খালের অসম্পূর্ণ অংশ দ্রুত খনন করে ভুলুয়া নদীর সঙ্গে সংযোগ নিশ্চিত করা হোক। অন্যথায় কয়েক হাজার মানুষকে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও দুর্ভোগের শিকার হতে হবে।