ফিরোজ আল আমিন, নিজস্ব প্রতিনিধি:
মাঠজুড়ে সোনালি ধানের সমারোহ, বাতাসে ভাসছে নতুন ধানের মিষ্টি গন্ধ। এমন সময়েই কৃষকের উঠোন যখন নতুন ফসলে ভরে ওঠার কথা, ঠিক তখনই নেমে এলো প্রকৃতির নির্মম আঘাত। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় অসময়ের টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। পাকা ধান ঘরে তোলার আগেই পানিতে ডুবে যাওয়ায় কৃষকের সোনালি স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার কৃষক পরিবারের চোখে-মুখে এখন শুধুই হতাশা আর অনিশ্চয়তার ছাপ।গত কয়েকদিনের অবিরাম বর্ষণে উপজেলার ধামাইনগর, সোনাখাড়া, চান্দাইকোনা, ধানগড়া, পাঙ্গাসী, ব্রহ্মগাছা, নলকা, ঘুড়কা ও ধুবিল ইউনিয়নের শত শত হেক্টর জমির রোপা আমন ধান এখন পানির নিচে। যে মাঠে থাকার কথা ছিল ধান কাটার উৎসব, সেখানে এখন শুধুই অথৈ পানি। অনেক জায়গায় ধানগাছ পুরোপুরি ডুবে যাওয়ায় সেগুলোতে পচন ধরতে শুরু করেছে। কৃষকরা অসহায়ভাবে তাকিয়ে দেখছেন তাদের সারা বছরের পরিশ্রম কীভাবে চোখের সামনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।পাঙ্গাসী গ্রামের প্রবীণ কৃষক আশরাফুল ইসলাম ভেজা চোখে বলেন, "বাপ-দাদার আমল থেকে চাষ করছি, কিন্তু এমন দুর্যোগ দেখিনি। ধান পেকে সোনা হয়ে আছে, অথচ ঘরে তোলার উপায় নেই। মাঠে নামার মতো পরিস্থিতিও নেই। এই ফসল না উঠলে ছেলেমেয়ে নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে।একই এলাকার আরেক কৃষক আব্দুল করিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, "এনজিও থেকে লোন নিয়ে চাষ করেছিলাম। ভেবেছিলাম ধান বিক্রি করে দেনা শোধ করব। কিন্তু বৃষ্টি আর উজানের ঢল আমার সব স্বপ্ন ভাসিয়ে নিয়ে গেল। আর কয়েকটা দিন পানি থাকলেই সব শেষ।উপজেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, এই বৃষ্টি রোপা আমন ধানের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে এনেছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মমিনুল ইসলাম বলেন, "এই সময়ে এমন বৃষ্টি একেবারেই অপ্রত্যাশিত এবং ফসলের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আমরা মাঠ পর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি। তবে পানি দ্রুত নিষ্কাশন না হলে ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো কঠিন হবে।" কৃষি অফিসের প্রাথমিক ধারণা, পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে।টানা বৃষ্টিতে শুধু ফসলের মাঠই নয়, গ্রামীণ সড়কগুলোও চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। হাটবাজার ও সংযোগ সড়কগুলোতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় ফসল পরিবহন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক কৃষক লোকসান কিছুটা কমানোর আশায় পানির নিচেই অর্ধেক দামে ধান বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা এখন সরকারের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাদের একটাই দাবি—দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হোক এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জরুরি আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হোক, যাতে তারা এই বিপর্যয় কাটিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। প্রকৃতির এই বিরূপ আচরণে কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হয়েছে, আর তাদের ভবিষ্যৎ ডুবে গেছে একরাশ অনিশ্চয়তায়।