সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা:
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের ঐতিহাসিক বড় সরদার বাড়ির কাঠামোগত ও সংরক্ষণগত পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন ছাড়াই মেরামতকাজ শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় মেরামতকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে প্রত্নস্থাপনা সংরক্ষণে অভিজ্ঞ স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দলের মাধ্যমে স্থাপনাটির কারিগরি মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছে সোনারগাঁওয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটি।
তবে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক কাজী মাহবুবুল আলমের দাবি, ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ প্রত্নতত্ত্ববিদের তত্ত্বাবধানেই বড় সরদার বাড়ির সংস্কার ও সংরক্ষণকাজ করা হচ্ছে।
সংরক্ষণ কমিটির অভিযোগ, গত ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে বড় সরদার বাড়ির দেয়ালের বিভিন্ন ক্ষতচিহ্ন মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে। অথচ পুরোনো গাঁথুনি, কাঠের সংযোগস্থল, ফাটল, আর্দ্রতা এবং ভারবহনকারী অংশের প্রকৃত অবস্থা নির্ণয়ে পূর্ণাঙ্গ কারিগরি পরীক্ষা করা হয়নি। সাধারণ ভবনের মতো শুধু দৃশ্যমান ক্ষতচিহ্ন মেরামত করা হলে স্থাপনাটির অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা আড়ালে থেকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংগঠনটি।
কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বড় সরদার বাড়িতে কোক স্টুডিও বাংলা সিজন-৪-এর শুটিংয়ের পর স্থাপনাটির দেয়াল, অলংকরণ ও নকশার বিভিন্ন অংশে ক্ষতির অভিযোগ ওঠে। শুটিংয়ের সময় উচ্চ ক্ষমতার জেনারেটর, ভারী ক্যামেরা, আলোকসজ্জা ও সাউন্ড সিস্টেমসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছিল। এসব সরঞ্জামের চাপ ও কম্পনের কারণে ঐতিহাসিক স্থাপনাটির কাঠামোতে কোনো প্রভাব পড়েছে কি না, তা নির্ধারণে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কারিগরি পরীক্ষা প্রয়োজন বলে মনে করছে কমিটি।
সোনারগাঁওয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শাহেদ কায়েস বলেন, বড় সরদার বাড়ির মেরামতের আগে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দলের মাধ্যমে কাঠামোগত ও সংরক্ষণগত মূল্যায়নের দাবি জানানো হয়েছিল। এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও মূল্যায়ন ছাড়াই দেয়াল মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
শাহেদ কায়েস বলেন, শুধু দৃশ্যমান ক্ষতচিহ্ন ঢেকে দিলেই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি নিরাপদ হয়েছে—এমনটি বলা যায় না। গাঁথুনির ফাটল, কম্পনের প্রভাব, কাঠের সংযোগস্থলের দুর্বলতা কিংবা ভারবহনকারী অংশের ক্ষতি থাকলে তা পরীক্ষা ছাড়া বোঝা সম্ভব নয়। বরং পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগে মেরামত করা হলে ক্ষতির গুরুত্বপূর্ণ আলামত আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি অবিলম্বে মেরামতকাজ স্থগিত করে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দলের মাধ্যমে বড় সরদার বাড়ির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের দাবি জানান। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশের ভিত্তিতে সংরক্ষণকাজ পরিচালনার আহ্বান জানান তিনি।
কমিটির পক্ষ থেকে প্রত্নস্থাপনা সংরক্ষণে অভিজ্ঞ স্থপতি, কাঠামো প্রকৌশলী, প্রত্নতত্ত্ববিদ ও সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন দল গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। দলটির মাধ্যমে বড় সরদার বাড়ির দেয়াল ও ছাদের গাঁথুনি, ফাটল, কাঠের সংযোগস্থল, আর্দ্রতা এবং ভারবহনকারী অংশ পরীক্ষা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া শুটিংয়ের আগে ও পরের স্থাপনাটির অবস্থার তুলনামূলক কারিগরি মূল্যায়ন করে একটি প্রতিবেদন তৈরির পাশাপাশি তা জনসমক্ষে প্রকাশের দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
এর আগে বড় সরদার বাড়ির ক্ষয়ক্ষতি, বাণিজ্যিক ভাড়া এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠনের দাবিতে গত ২৯ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে সোনারগাঁওয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটি। একই দাবিতে ৩১ আগস্ট সোনারগাঁও জাদুঘরের মূল ফটকের সামনে মানববন্ধন করা হয়।
পরে গত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রতিকার চেয়ে প্রধানমন্ত্রী, সংস্কৃতিমন্ত্রী, ইউনেস্কো এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের কাছে স্মারকলিপি দেয় সংগঠনটি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক কাজী মাহবুবুল আলম এসব অভিযোগের বিষয়ে বলেন, সোনারগাঁওয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটি ভুল তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। ঐতিহাসিক বড় সরদার বাড়ি সংস্কার ও সংরক্ষণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) বিশেষজ্ঞ প্রত্নতত্ত্ববিদ অধ্যাপক আবু সাঈদের তত্ত্বাবধানে সংস্কারকাজ পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি জানান, এর আগে ২০২১ সালে বড় সরদার বাড়িতে প্রথম দফায় সংস্কারকাজ করা হয়েছিল। বর্তমানে ২০২৬ সালে স্থাপনাটির ছাদ এবং ছোটখাটো ভাঙা অংশগুলো সংস্কার করা হচ্ছে।
ঐতিহাসিক বড় সরদার বাড়ির মতো প্রত্নস্থাপনার ক্ষেত্রে সংরক্ষণকাজ কতটা বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে—এ প্রশ্নে দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। ফলে স্থাপনাটির প্রকৃত অবস্থা নির্ণয়ে স্বাধীন ও স্বচ্ছ কারিগরি মূল্যায়নের দাবি এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।