পলাশ পাল, জেলা প্রতিনিধি নেত্রকোনা
খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা হিসেবে পরিচিত Netrokona-এর হাওরাঞ্চলে এবার আগাম ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বোরো ধান চাষে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ধান কাটার মৌসুমে একের পর এক হাওর তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের সোনালি স্বপ্ন এখন পানির নিচে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রায় ৮০ হাজার কৃষক এই বোরো বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭৫ কোটি টাকারও বেশি। পানিতে তলিয়ে ও নষ্ট হয়েছে বিপুল পরিমাণ পাকা ধান, যা এখন কৃষকদের জন্য চরম হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অল্প কিছুদিন আগেও হাওরের বিস্তীর্ণ মাঠে পাকা ধানের সোনালি আভা ছড়িয়ে ছিল। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে এখন সেই মাঠগুলো পরিণত হয়েছে বিশাল জলরাশিতে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে বুকসমান পানিতে নেমে বা নৌকা ব্যবহার করে ধান কাটছেন। কেউ কেউ আবার ভেজা ধান শুকানোর চেষ্টা করছেন, তবে তাতেও ক্ষতির পরিমাণ কমছে না—বরং অনেক ধান ইতোমধ্যে পচতে শুরু করেছে।
কর্তনকৃত ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা দ্বিগুণ সংকটে পড়েছেন। একদিকে ফসলহানি, অন্যদিকে বাজারে দাম না থাকায় আর্থিক চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, জেলার ১০ উপজেলায় প্রায় ১৬ হাজার ৭৭৮ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে প্রায় ১৮ হাজার ৪৭৮ হেক্টর জমি। এতে সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়েছে প্রায় ৭৫ হাজার ৯৪৯ দশমিক ৪৩ টন ধান, যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৩৭২ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
হাওরাঞ্চলেই এ বছর ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছিল। এর মধ্যে ৩৮ হাজার ২৩৮ জন কৃষকের ১১ হাজার ২৩০ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। শুধুমাত্র হাওর এলাকায় উৎপাদন ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৮ হাজার ২৭১ দশমিক ৫০ টন ধান, যার বাজারমূল্য প্রায় ২৩৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।
এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি তারা “হাওরের কৃষকের কান্না থামবে কবে” স্লোগানে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। আন্দোলন থেকে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—বিএডিসির বীজ সংক্রান্ত অভিযোগের বিচার বিভাগীয় তদন্ত, কৃষিঋণ মওকুফ, হাওরের ইজারা ব্যবস্থা বাতিল, ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির তদন্ত এবং ক্ষতিপূরণ ও পশুখাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা।
কৃষকদের অভিযোগ, দুর্যোগের সময় যথাযথ সরকারি সহায়তা না পাওয়া এবং ধানের ন্যায্যমূল্য না থাকায় তারা আরও বেশি সংকটে পড়েছেন। দ্রুত শ্রমিক সংকট নিরসন, আর্থিক সহায়তা ও বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে Department of Agricultural Extension জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা স্বচ্ছভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং সরকারি প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। Amirul Islam বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।”
চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৯০ টন।
জেলা প্রশাসক Khandaker Mushfiqur Rahman জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় আনার জন্য তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। সঠিক তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে দ্রুতই পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হবে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া