নিজস্ব প্রতিবেদক: মোক্তার হোসেন
---------------------------------------
বাংলার আকাশে ২০২৪ সালের জুলাই ছিল দ্রোহের মেঘে আচ্ছন্ন। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিস্ফোরিত হলো তরুণ সমাজ। যা শুরু হয়েছিল কোটা সংস্কার নামক একটি যৌক্তিক দাবি দিয়ে, তা এক মাসের ব্যবধানে রূপ নিলো এক সর্বাত্মক গণঅভ্যুত্থানে। এই অভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারের পতন ঘটায়নি, বরং সমগ্র জাতির চেতনায় নতুন করে প্রোথিত করেছে নাগরিকের অধিকার" ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার ধারণা।
জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্ররা নেমেছিল শান্তিপূর্ণ মিছিলে। দাবি ছিল একটাই - মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র সেই যৌক্তিক কণ্ঠকে রুদ্ধ করতে চেয়েছিল দমন-পীড়ন, গ্রেফতার ও প্রহসনমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে। ফল যা হবার তাই হলো। ক্যাম্পাস থেকে রাজপথ, রাজপথ থেকে মহল্লা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল প্রতিরোধ।
১৬ জুলাই। আবু সাঈদ, মুগ্ধ সহ প্রথম শহীদের রক্তে রঞ্জিত হলো রাজপথ। সেই রক্তই হয়ে উঠলো লক্ষ কোটি মানুষের ঐক্যের সিমেন্ট। ছাত্র-জনতা বুঝে গেল, এটি আর কোটার লড়াই নয়। এটি অস্তিত্বের লড়াই। এটি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার রক্ষার লড়াই।
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, কারফিউ, সেনা মোতায়েন রাষ্ট্র তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করল আন্দোলন দমানোর জন্য। কিন্তু ঘরে ঘরে, গলিতে গলিতে গড়ে উঠল প্রতিরোধ কমিটি। শিক্ষক, অভিভাবক, পেশাজীবী, শ্রমিক সবাই নেমে এলো রাজপথে। আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরেএই স্লোগানে প্রকম্পিত হলো বাংলার প্রতিটি প্রান্তর।
এক দফা এক দাবি। সরকারের পদত্যাগ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম থেকে আসল চূড়ান্ত ঘোষণা। সারাদেশ থেকে মানুষ ঢল নামল রাজধানীর দিকে। ইতিহাস সাক্ষী হলো, জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার কাছে কোনো ব্যারিকেডই টেকে না।
সকাল থেকেই লাখো মানুষের ঢল। বেলা বাড়ার সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় স্থাপনাগুলো জনতার দখলে। অপরাহ্নে আসল সেই ঐতিহাসিক সংবাদ দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান। প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ও দেশত্যাগ।
এই দিনটি প্রমাণ করল, "জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস"। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হলো দ্বিতীয় স্বাধীনতা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিছক একটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নয়। এটি একটি সাংস্কৃতিক ও নৈতিক পুনর্জাগরণ।
,এটি তরুণ প্রজন্মের হাতে নেতৃত্বের মশাল তুলে দিয়েছে। প্রমাণ করেছে, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাদের আছে।
এটি রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দিয়েছে তার সীমা। রাষ্ট্র জনগণের সেবক, প্রভু নয়।
এটি আমাদের শিখিয়েছে ঐক্যের শক্তি। ধর্ম, বর্ণ, পেশা নির্বিশেষে একটি জাতি কিভাবে এক কাতারে দাঁড়িয়ে ইতিহাস বদলে দিতে পারে।
জুলাই আমাদের অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। কেড়ে নিয়েছে আবু সাঈদ, মুগ্ধর মতো অসংখ্য তরতাজা প্রাণ। কিন্তু বিনিময়ে দিয়ে গেছে এক নতুন স্বপ্ন একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন।
আজ ৫ আগস্ট। বর্ষপূর্তিতে আমাদের শপথ হতে হবে "শহীদের রক্ত যেন বৃথা না যায়। তাদের দেখানো পথেই আমরা গড়বো সেই বাংলাদেশ, যেখানে কথা বলার স্বাধীনতা থাকবে, ভোটের অধিকার থাকবে, মাথা উঁচু করে বাঁচার মর্যাদা থাকবে।
জুলাই শেষ হয়নি। জুলাই চলছে। জুলাই থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, একটি জ্বলন্ত মশাল হয়ে।
লেখক: মোক্তার হোসেন
সিনিয়র শিক্ষক, বেজপাড়া হায়াতুননেছা দাখিল মাদ্রাসা, কয়রা, খুলনা।