যাদব চন্দ্র রায়
নির্বাহী পরিচালক, সিডিসি, দিনাজপুর
১৯৯২ সাল। এক বুক স্বপ্ন আর উত্তরের অবহেলিত মানুষের জন্য কিছু করার অদম্য প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিডিসি)। আজ, তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে পেছনে তাকালে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সংগ্রাম, ত্যাগ, ভালোবাসা আর মানুষের পাশে দাঁড়ানোর হাজারো গল্প। এই পথচলা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রা নয়; এটি ছিল অধিকারবঞ্চিত মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ের এক নিরন্তর লড়াই।
শুরু থেকেই সিডিসি কাজ করেছে সমাজের সেইসব মানুষের জন্য, যাদের দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। আদিবাসী, দলিত, মুচি, মেথরসহ সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমরা নিরলসভাবে কাজ করেছি। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, নারী, কন্যাশিশু ও প্রবীণদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও ছিল আমাদের অবিচল প্রচেষ্টা।
দিনাজপুরের উত্তর জনপদের সেই মানুষগুলোর কথা আজও হৃদয়কে নাড়া দেয়, যাদের ঠোঁটকাটা ও তালুকাটা সমস্যার কারণে সমাজ অভিশপ্ত মনে করত। সিডিসি’র উদ্যোগে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষের অপারেশনের মাধ্যমে তাদের মুখে ফিরিয়ে আনা গেছে হাসি, আত্মবিশ্বাস এবং নতুন জীবনের স্বপ্ন। এটি শুধু চিকিৎসা সহায়তা নয়, বরং মানবিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার এক অনন্য প্রয়াস।
আমাদের আন্দোলন ছিল শেকড় থেকে উঠে আসা মানুষের আন্দোলন। হিন্দু বিবাহ আইনের দাবিতে সিডিসি’র সূচিত আন্দোলন পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে এক ঐতিহাসিক সাফল্যে পরিণত হয়। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে প্রতিবন্ধী-বান্ধব করার উদ্যোগও সফল হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের মূলধারার শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করতে শত শত শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যারা আজ মমতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন।
২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় যখন হাজারো পরিবার দিশেহারা হয়ে পড়ে, তখন সিডিসি ৩২শ পরিবারের জন্য মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসে। আমাদের মানবিক সহায়তা পৌঁছে গেছে বরিশালের উজিরপুর থেকে শুরু করে পটুয়াখালীর সিডরবিধ্বস্ত জনপদেও। শুধু ত্রাণ বিতরণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি সিডিসি; আমরা গড়ে তুলেছি দক্ষ ও সচেতন মানবসম্পদ। সিডিসি’র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৩০০-এর বেশি ভলান্টিয়ার আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্বাবলম্বী হয়ে কাজ করছেন—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।
তবে এই দীর্ঘ পথচলা কখনোই সহজ ছিল না। খাস জমির অধিকার আদায়ে আন্দোলন করতে গিয়ে নানা বাধা, হুমকি ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করতে গিয়ে শুনতে হয়েছে অপবাদ, সহ্য করতে হয়েছে অপমান। সালিশ ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে অসংখ্য ভাঙা পরিবারকে আবার একত্রিত করা হয়েছে। গাছ লাগানো, যুব ক্লাব গঠন এবং কৃষি উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে সমাজকে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এতসব অর্জনের পরও একটি দীর্ঘশ্বাস থেকে যায়। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ এগোলেও বৈষম্য এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। ধর্মীয় সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে বিভিন্ন সময় সিডিসি এবং ব্যক্তিগতভাবে আমাকে সরকারি উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ব্যথিত হয়েছি তখন, যখন ঘুষ না দেওয়ার কারণে বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশনের নিয়মিত সহযোগিতা থেকেও আমাদের বঞ্চিত করা হয়।
একজন সমাজকর্মী হিসেবে তখন প্রশ্ন জাগে—এ কেমন ন্যায়বিচার? যেখানে দুর্নীতির করাল গ্রাসে দরিদ্র মানুষের প্রাপ্য অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেখানে কীভাবে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে উঠবে?
তবুও সিডিসি আদর্শের জায়গা থেকে কখনো আপস করেনি। দুর্নীতির কাছে মাথা নত করা আমাদের শিক্ষা নয়। আমরা বিশ্বাস করি—মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার কর্মে, মানবিকতায়; ধর্ম, বর্ণ কিংবা পরিচয়ে নয়।
আজ সমাজের বিবেকবান মানুষের প্রতি আমাদের আহ্বান—আসুন, আমরা সবাই মিলে বৈষম্য, দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াই। একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে প্রতিটি মানুষ মর্যাদা ও সমঅধিকার নিয়ে বাঁচতে পারে।
আমাদের পথচলা থেমে নেই, থামবেও না। কারণ আমাদের শক্তি সেই সাধারণ মানুষের ভালোবাসা, যাদের চোখের জল মুছতে পেরেছি, যাদের মুখে ফিরিয়ে দিতে পেরেছি আশার আলো।