মোখলেছুর রহমান ধনু
রামগতি-কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি
লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার মাতাব্বরহাট ও মতিরহাট আন্তঃবিভাগীয় খেয়াঘাটের ইজারা পরিচালনায় নানা অনিয়ম, ইজারা শর্ত লঙ্ঘন এবং যাত্রী নিরাপত্তা উপেক্ষার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর ইজারাদার মোহাম্মদ মুক্তার হোসেনের বিরুদ্ধে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, মাঝিমাল্লা ও সাধারণ যাত্রীরা দাবি করছেন, সরকারি নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন ধরে ঘাটটি পরিচালিত হচ্ছে, ফলে প্রতিদিনই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পারাপার করতে হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কমলনগর উপজেলার চর কালকিনি ইউনিয়নের বাসিন্দা মোহাম্মদ মুক্তার হোসেন ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য আন্তঃবিভাগীয় এই খেয়াঘাটের ইজারা গ্রহণ করেন। অভিযোগ রয়েছে, বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি ইজারা গ্রহণের পর ঘাট পরিচালনায় নানা অনিয়ম করছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও জেলা পরিষদের ইজারা চুক্তিতে ঘাটটি কোনো অবস্থাতেই তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর বা উপ-ইজারা দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে স্থানীয়দের দাবি, ইজারাদার ঘাটটি প্রায় ২২ লাখ টাকার বিনিময়ে অন্য এক ব্যক্তির কাছে পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন, যা চুক্তির শর্তের পরিপন্থী।
এ বিষয়ে ইজারাদার মোহাম্মদ মুক্তার হোসেনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি ঘাট অন্যের কাছে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তাঁর দাবি, ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে সরকারি বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "এসব বিষয় বহুদিন ধরেই এভাবেই চলে আসছে।"
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ঘাটে বিআইডব্লিউটিএ ও নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর কর্তৃক নিবন্ধিত ও ফিটনেস সনদপ্রাপ্ত মোট আটটি যাত্রীবাহী নৌযান, প্রতিটি নৌযানে নামফলক এবং অন্তত দুইজন দক্ষ মাঝি বা সারেং থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেখানে মাত্র তিনটি ছোট নৌকায় যাত্রী পারাপার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া যাত্রী ওঠানামার জন্য প্রয়োজনীয় জেটি বা সিঁড়ি নেই। বর্ষা মৌসুমে নদী উত্তাল থাকলেও অতিরিক্ত যাত্রী, দুধের ক্যান এবং বিভিন্ন মালামাল বহন করে নৌযান চলাচল করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে।
ঘাট ব্যবহারকারী জামাল উদ্দিনসহ কয়েকজন যাত্রী জানান, প্রতিদিন কাদা-পানি মাড়িয়ে নৌকায় উঠতে হয়। ঘাটে নেই যাত্রীছাউনি, গণশৌচাগার কিংবা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। চারপাশে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
অভিযোগ রয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী ঘাটে চলাচলকারী নৌযানের তালিকা জেলা পরিষদে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। অনুসন্ধানে জেলা পরিষদেও এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথি পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে জেলা পরিষদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নথিপত্র পর্যালোচনার জন্য সময় চেয়েছেন।
বিআইডব্লিউটিএর পরিবহন পরিদর্শক আব্দুর রহমান বলেন, বর্ষাকালে সতর্ক সংকেত চলমান থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকিপূর্ণভাবে যাত্রী পারাপার করা হচ্ছে। একাধিকবার সতর্ক করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ইজারা শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং খেয়াঘাটে নিরাপদ নৌযান, জেটি, যাত্রীছাউনি ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।