মোখলেছুর রহমান ধনু
রামগতি-কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি
লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে চাঞ্চল্যকর নির্মাণ শ্রমিক নুরুল আলম নুরু হত্যা মামলায় মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড (সিডিআর) সূত্রে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগ ও আইনি প্রক্রিয়ায় সর্বস্বান্ত হওয়ার অভিযোগ তুলে একই পরিবারের তিন সদস্য মানববন্ধন করেছেন। তারা নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বেকসুর খালাসের দাবি জানান।
শনিবার (৪ জুলাই) সকাল ১১টার দিকে উপজেলার চরকাদিরা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ছিদ্দিকিয়া দাখিল মাদ্রাসা সংলগ্ন সড়কে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থানীয় কয়েকশ নারী-পুরুষ অংশ নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।
মানববন্ধনে বক্তব্য দিতে গিয়ে মামলার প্রধান সন্দেহভাজন ও বর্তমানে জামিনে থাকা নুরুন্নেহার পাখি বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, প্রায় এক বছর আগে একটি রং নম্বর থেকে নুরুল আলম নুরুর সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং পরবর্তীতে তাদের মধ্যে ভাই-বোনের মতো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি জানান, গত ১৯ জানুয়ারি নুরুর মোবাইল ফোন বন্ধ পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন। পাখি বেগম বলেন, “আমি যদি অপরাধী হতাম, তাহলে মোবাইল চালু রেখে নিজ বাড়িতে অবস্থান করতাম না। আমার স্বামী একজন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ইটভাটা শ্রমিক। সাত বছরের মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়। জামিনের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে আমরা এখন ঋণগ্রস্ত।”
মামলার অপর আসামি দিনমজুর জহিরুল ইসলাম বলেন, “আমি নুরুকে কখনো দেখিনি, চিনিও না। পরিবারের সদস্য হিসেবে ভাতিজি পাখির সঙ্গে ফোনে কথা বলাই কি আমার অপরাধ? বিনা অপরাধে সাড়ে তিন মাস কারাভোগ করেছি। জামিনের জন্য একমাত্র বসতভিটাও বিক্রি করতে হয়েছে।”
অপর আসামি কামাল হোসেনও আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “আমার পরিবারের মধ্যে পঙ্গু সন্তান ও বিয়ে উপযোগী মেয়ে রয়েছে। জামিনের খরচ জোগাতে ১০ শতাংশ বসতভিটা বিক্রি করেছি। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে খালাস না পেলে আমাদের সামনে আর কোনো পথ থাকবে না।”
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী এলাকাবাসী ও বক্তারা বলেন, শুধুমাত্র কল তালিকার ভিত্তিতে নিরীহ ও দিনমজুর মানুষদের হত্যা মামলায় জড়ানো উচিত হয়নি। প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে মামলাটির নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্ত প্রয়োজন।
নিহত নুরুল আলম নুরুর নিকটাত্মীয় ও স্থানীয় ফজুমিয়ারহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী অধ্যক্ষ লোকমান হোসেন বলেন, “আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে এই তিনজনই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। নুরুর মোবাইলে এক নারীর সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র ধরে পুলিশ প্রথমে তাকে এবং পরে তার দুই আত্মীয়কে আটক করে। তারা অত্যন্ত সাধারণ ও দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষ। তদন্তকারী সংস্থার উচিত প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে নিরপরাধদের অব্যাহতি দেওয়া।”
মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, উপজেলার সাহেবের হাট ইউনিয়নের বাসিন্দা ও নির্মাণ শ্রমিক নুরুল আলম নুরু গত ১৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় নিখোঁজ হন। তিন দিন পর, ১৯ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মাতাব্বরহাট এলাকার মেঘনা নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধের সিসি ব্লকের ওপর থেকে শরীরে আঘাতের চিহ্নসহ তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পরে নুরুর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে নুরুন্নেহার পাখি বেগমের নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের তথ্য পাওয়ার ভিত্তিতে ১৯ জানুয়ারি রাতেই পাখি বেগম, তার চাচা জহিরুল ইসলাম এবং ফুফা কামাল হোসেনকে আটক করা হয়। দীর্ঘ তিন মাস ১৬ দিন কারাভোগের পর তারা সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পান। আদালতের নির্দেশে বর্তমানে মামলাটি জেলা সিআইডি তদন্ত করছে।
মামলার তদন্ত অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর জেলা সিআইডির কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্ব ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। সিআইডি প্রযুক্তিগত তথ্য ব্যবহার করলেও শুধুমাত্র কল রেকর্ডের ভিত্তিতে কাউকে চূড়ান্ত অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করে না। কোনো নিরীহ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন এবং প্রকৃত অপরাধীরা যাতে আইনের আওতার বাইরে না থাকে, সেটিই আমাদের লক্ষ্য। তদন্তে যদি এই তিনজনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়া যায়, তাহলে আইন অনুযায়ী তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হবে।”