ফিরোজ আল আমিন
নিজস্ব প্রতিনিধি:
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বিষমডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন হয়রানির অভিযোগের ঘটনায় প্রশাসনিক তদন্ত কার্যক্রম শেষ হয়েছে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী তদন্তে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদেরসহ মোট ৪০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছে উপজেলা প্রশাসনের গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি। এখন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে প্রশাসন। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইন ও বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহানের নির্দেশনায় গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গত মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিষমডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে। তদন্তে অভিযোগকারী শিক্ষার্থী, তাদের অভিভাবক, প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়। একই সঙ্গে প্রত্যেকের লিখিত বক্তব্যও সংরক্ষণ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির প্রধান এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেনগুপ্তা বলেন, "আমরা অত্যন্ত সতর্কতা ও গোপনীয়তা বজায় রেখে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। শিক্ষার্থীদের মৌখিক ও লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগে বিস্তারিত কিছু বলা সমীচীন হবে না। তবে সকল পক্ষের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।"
সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি
উপজেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা হলেন—উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেনগুপ্তা (আহ্বায়ক), উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. সিরাজুম মনিরা জুঁই, তাড়াশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাবিবুর রহমান, উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা খাদিজা নাসরিন, তাড়াশ মহিলা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মাজহারুল ইসলাম, বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য জিল্লুর রহমান এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল কাদের বিশ্বাস।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
গত ২২ জুন বিষমডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ উত্থাপিত হলে বিষয়টি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, তাড়াশ থানা এবং জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের বিশেষ নারী তদন্ত টিমের সমন্বয়ে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও গণশুনানির আয়োজন করা হয়।
পরদিন ২৩ জুন অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে উপজেলা পরিষদ চত্বরে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানের কিছু শিক্ষক ছাত্রীদের সঙ্গে অনৈতিক আচরণ করে আসছিলেন এবং বিষয়টি প্রকাশ করতে গেলে অনেককে ভয়ভীতি ও নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
ক্রমবর্ধমান জনমত ও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসন সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। গত ৩০ জুন তদন্ত কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়।
ভয়ভীতির অভিযোগ শিক্ষার্থীদের
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ ও অনিরাপত্তার মধ্যে ছিলেন। অভিযোগ প্রকাশের পরও তাদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে।
এক শিক্ষার্থী বলেন, "আমরা শুধু নিরাপদ পরিবেশে লেখাপড়া করতে চাই। অভিযোগ করার পর আমাদের চুপ থাকতে চাপ দেওয়া হয়েছে। আমরা চাই প্রশাসন সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের শাস্তির আওতায় আনুক।"
অন্য এক শিক্ষার্থী বলেন, "আমাদের অনেকেই ভয়ে আগে কিছু বলতে পারেনি। এখন আমরা প্রশাসনের কাছে ন্যায়বিচার চাই।"
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি অভিভাবকদের
স্থানীয় অভিভাবক তপন কুমার রজক বলেন, "শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হওয়ার কথা। যদি কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অনৈতিক আচরণে জড়িত থাকেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত।"
তিনি আরও বলেন, "এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।"
অভিযোগ অস্বীকার অভিযুক্ত শিক্ষকের
অভিযুক্ত শিক্ষকদের একজন বরাবরের মতোই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করার জন্য পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।"
প্রশাসনের অবস্থান
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতি নুসরাত জাহান বলেন, "যৌন নিপীড়নের অভিযোগ অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই আমরা নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করতে বহুমাত্রিক প্রতিনিধিত্ব রেখে তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
জেলা শিক্ষা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, "শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের অগ্রাধিকার। তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপও বিবেচনা করা হবে।"
প্রতিষ্ঠানটির পরিচিতি
জানা গেছে, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার দেশিগ্রাম ইউনিয়নের বিষমডাঙ্গা গ্রামে ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিষমডাঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালে এটি স্কুল অ্যান্ড কলেজে উন্নীত হয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি উপজেলার অন্যতম স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে সাম্প্রতিক এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
এদিকে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্ট সবাই। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।