মোঃ হাসানুর জামান বাবু, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ২ হাজার ২৬০ কোটি ২৪ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেছেন ডা. শাহাদাত হোসেন। মঙ্গলবার নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ বাজেট ঘোষণা করেন। একইসঙ্গে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের ১ হাজার ৬৬৫ কোটি ৯২ লাখ ১৬ হাজার ৪০০ টাকার সংশোধিত বাজেটও উপস্থাপন করা হয়। গত অর্থবছরে চসিকের বাজেট ছিল ২ হাজার ১৪৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
বাজেট ঘোষণাকালে চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন এবং প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
বাজেট বক্তৃতায় মেয়র জানান, তিনি ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর দায়িত্ব গ্রহণের সময় চসিকের দেনা ছিল ৫৯৬ কোটি টাকা, যা বর্তমানে কমে ৩৮০ কোটিতে নেমে এসেছে। চলতি অর্থবছরে আয়কর বাবদ ৪৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা এবং ভ্যাট বাবদ ৮৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ তহবিল ও আনুতোষিক বাবদ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে কাজ চলছে উল্লেখ করে মেয়র বলেন, অযৌক্তিকভাবে নির্ধারিত গৃহকর পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে যৌক্তিক করা হচ্ছে। পাশাপাশি বন্দর, রেলওয়ে, কন্টেইনার টার্মিনাল এবং বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বকেয়া রাজস্ব পরিশোধে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, নগরীর সড়কগুলোর ধারণক্ষমতা ১০ টন হলেও বন্দরের ভারী যানবাহন ২০ থেকে ৩৫ টন পর্যন্ত ওজন বহন করায় প্রতিবছর সড়ক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।
রাজস্ব আদায় ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ডিজিটাল হোল্ডিং ট্যাক্স ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মেয়র। এর ফলে নাগরিকরা ঘরে বসেই অনলাইনে কর পরিশোধ করতে পারবেন এবং কর আদায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। এছাড়া ট্রেড লাইসেন্সের সংখ্যা বাড়িয়ে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চসিকের জনবল কাঠামো শক্তিশালী করার বিষয়ে তিনি জানান, বর্তমানে অনুমোদিত জনবল ৪ হাজার ২২৬ জন হলেও প্রায় ৭০ লাখ মানুষের নগরীতে সেবা দিতে অতিরিক্ত জনবল প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে নতুন সাংগঠনিক কাঠামো ও নিয়োগবিধি প্রণয়নের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ১২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
নগরীর ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধ, মশক নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে জানান মেয়র।
সবুজায়ন কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে ৫ লাখ গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে এবং আগামী অর্থবছরে আরও ১০ লাখ গাছের চারা রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে।
হকার সমস্যার স্থায়ী সমাধানে নগরীর চারটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে মেয়র বলেন, এ বিষয়ে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। ইপিজেড, আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাট ও স্টেশন রোড এলাকায় এসব মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
নগরবাসীর অভিযোগ ও সমস্যা দ্রুত সমাধানের জন্য "আমাদের চট্টগ্রাম" নামে একটি ওয়ান-স্টপ সিটিজেন সার্ভিস অ্যাপ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে নাগরিকরা পরিচ্ছন্নতা, মশক নিধন, হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স ও স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত বিষয় সরাসরি জানাতে পারবেন।
মেয়র ঐতিহাসিক শহিদ জিয়া জাদুঘর সংরক্ষণের উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ বিষয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য চারটি প্রধান কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, স্বচ্ছ নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি, নতুন সাংগঠনিক কাঠামো প্রণয়ন এবং চসিকের সকল কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশনের জন্য ইআরপি সফটওয়্যার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্বাস্থ্যখাতে চট্টগ্রামকে "হেলদি সিটি" হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিএফআইডিসি রোডে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৪৪টি আয়বর্ধক প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
স্মার্ট সিটি গঠনের অংশ হিসেবে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নগরীর ১৩৫ কিলোমিটার সড়কে ৫ হাজার ৫০০টি স্মার্ট এলইডি বাতি স্থাপন কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি এআই-ভিত্তিক ক্যামেরা ও স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা প্রকল্পও বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
অবকাঠামো উন্নয়নে এয়ারপোর্ট রোডসহ বিভিন্ন সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ৩২৪টি উপ-প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে ৭৬৯ কিলোমিটার সড়ক, ৩৮টি ফুটওভার ব্রিজ, ১৪টি সেতু ও ২২টি কালভার্ট নির্মাণ করা হবে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল খনন প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন খাল, প্রতিরোধ দেয়াল, সড়ক ও ফুটপাথ নির্মাণ করা হয়েছে, যার ফলে নগরীর ১২টি ওয়ার্ড জলাবদ্ধতামুক্ত হয়েছে বলে দাবি করেন মেয়র।
পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রতিদিন উৎপাদিত প্রায় ৩ হাজার ২০০ টন বর্জ্যের ৮১ শতাংশ সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্যানিটারি ল্যান্ডফিল স্থাপন এবং মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা, পরিবেশবান্ধব লার্ভিসাইড প্রয়োগ এবং বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা চালু রাখার কথাও উল্লেখ করেন মেয়র।