মো. হোসেন, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরা ইউনিয়নের রাজাপুর এলাকায় এক গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহত গৃহবধূ নাসরিন আক্তার প্রিয়া (ছদ্মনাম) এর পরিবারের দাবি, এটি আত্মহত্যা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তবে স্বামী নুরুন্নবী জনির দাবি, পারিবারিক ও মানসিক সমস্যার কারণে তার স্ত্রী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন।
জানা গেছে, গত ২৫ জুন বৃহস্পতিবার দুপুরে সীতাকুণ্ডের বড় কুমিরা নিউ রাজাপুর এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। স্থানীয় রোজ গার্ডেন একাডেমির শিক্ষক নুরুন্নবী জনির বাড়ির সিঁড়িঘরের ফ্লোরে নাসরিন আক্তার প্রিয়ার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে খবর পেয়ে নিহতের স্বজন ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে।
ঘটনাটি নিয়ে শুরু থেকেই ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। একদিকে শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা দাবি করছেন, প্রিয়া আত্মহত্যা করেছেন। অন্যদিকে, নিহতের পরিবারের অভিযোগ, ঘটনাটি আত্মহত্যা নয়, বরং পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
নিহতের বড় ভাই সুমন অভিযোগ করেন, তার বোনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তিনি বলেন, "সিঁড়িঘরের লোহার অ্যাঙ্গেলে একটি ওড়না পেঁচানো ছিল, কিন্তু সেখানে আত্মহত্যার কোনো সুস্পষ্ট আলামত পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থলে একটি টেবিল ও তার ওপর রাখা পানির বোতলও স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল।"
তিনি আরও দাবি করেন, তার বোনের স্বামী নুরুন্নবী জনির সঙ্গে স্থানীয় এক নারীর দীর্ঘদিনের পরকীয়া সম্পর্ক ছিল। এ বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ করায় প্রিয়াকে প্রায়ই মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো। এছাড়া সন্তান না হওয়া নিয়েও তাকে বিভিন্নভাবে অপমান করা হতো বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নিহতের আরেক ভাই সাইফুল ইসলাম জানান, ঘটনার দিন জনির ছোট ভাই ফোন করে তাদের জানায় যে, "আপনার বোন স্ট্রোক করেছে, দ্রুত চলে আসুন।" তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রিয়ার মরদেহ ফ্লোরে পড়ে থাকতে দেখেন। তার দাবি, আত্মহত্যার কোনো দৃশ্যমান আলামত না থাকলেও মরদেহের মাথা, কপাল ও পিঠে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং পেটও ফোলা অবস্থায় দেখা গেছে।
সাইফুল ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে তাদের বোনের দাফন দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হয়েছিল। পরে পুলিশকে খবর দিলে তারা মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
অন্যদিকে, নিহতের স্বামী নুরুন্নবী জনি দাবি করেন, তাদের প্রায় ছয় বছরের দাম্পত্য জীবন মোটামুটি সুখের ছিল। যদিও তাদের কোনো সন্তান হয়নি, তবুও তিনি স্ত্রীকে মানসিকভাবে সমর্থন দিয়ে আসছিলেন। তিনি বলেন, "আমার স্ত্রীর কিছু ব্যক্তিগত ও মানসিক সমস্যা ছিল। সন্তান না হওয়ার বিষয়টি নিয়ে সে প্রায়ই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ত। অভিমান ও মানসিক যন্ত্রণার কারণেই সে আত্মহত্যা করেছে বলে আমার ধারণা।"
তবে আত্মহত্যার পর মরদেহ কে নামিয়েছে—এ বিষয়ে বিভিন্ন বক্তব্যে অসঙ্গতি রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে নিহতের পরিবার।
এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) কামরুল হাসান বলেন, "গৃহবধূর মরদেহ মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। আপাতত এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে।"
পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ভিত্তিতেই নাসরিন আক্তার প্রিয়ার মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে। বর্তমানে ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।