মোখলেছুর রহমান ধনু
রামগতি-কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি
লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে ধান সংগ্রহের মাধ্যমে সরকারি কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা।
অভিযোগ রয়েছে, হাজিরহাট খাদ্যগুদামে চলতি মৌসুমের ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এই চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন খাদ্যগুদামের এক দায়িত্বশীল কর্মচারী মো. হাছান। গুদামের ভেতরে ও বাইরে তার দালালচক্রের সক্রিয়তা এখন ‘ওপেন সিক্রেট’ বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক ব্যক্তি।
কাগজে-কলমে কৃষক, বাস্তবে ব্যবসায়ী
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে হাজিরহাট খাদ্যগুদামে সরকারি ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫০ মেট্রিক টন। এ জন্য উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে ৪২২ জন কৃষকের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে এসব তালিকাভুক্ত অনেক কৃষক ধান সরবরাহের সুযোগ পাচ্ছেন না।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, সিন্ডিকেট চক্রটি বিভিন্ন কৃষকের নাম ও কৃষি কার্ড ব্যবহার করে প্রকৃত কৃষকদের পরিবর্তে বড় ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করছে। এতে প্রকৃত কৃষকরা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
মনপ্রতি শত শত টাকা লাভের অভিযোগ
সরকার নির্ধারিত ধানের ক্রয়মূল্য বর্তমানে প্রতি মণ ১ হাজার ৪৪০ টাকা। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, সিন্ডিকেট চক্রটি মাঠপর্যায়ে ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে নিম্নমানের ও আর্দ্রতাযুক্ত ধান প্রতি মণ ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় কিনে সরকারি গুদামে সরবরাহ করছে।
এছাড়া, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ধান গ্রহণের বিনিময়ে প্রতি টনে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ৭৫ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কৃষকদের কার্ড ব্যবহার করে এই অর্থ সংগ্রহের পর তা বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগবাটোয়ারা করা হয়।
ডিওর চাল নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ
শুধু ধান সংগ্রহ নয়, সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের ডিও (ডিলিভারি অর্ডার) চাল ক্রয়-বিক্রয় নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে কম দামে চাল কিনে পরে তা গুদামে সংরক্ষণ করে অধিক মূল্যে ব্যবসায়ী ও খোলা বাজারের বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে।
কৃষকদের দাবি তদন্তের
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, গুদামের মাধ্যমে সম্প্রতি যেসব ধান সংগ্রহ করা হয়েছে, সেগুলোর উৎস ও মান যাচাই-বাছাই করলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। একই সঙ্গে তারা প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে পুনরায় ধান সংগ্রহের জোর দাবি জানিয়েছেন।
যা বলছেন কর্মকর্তারা
এ বিষয়ে হাজিরহাট খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিশাদ জাহান বলেন,
"আমার কিছু প্রকৃত কৃষক তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। আমরা নতুন করে চাহিদা পাঠিয়েছি। বরাদ্দ এলে তাদের কাছ থেকেও ধান সংগ্রহ করা হবে।"
তবে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধান সংগ্রহ ও খাদ্য অফিস প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন,
"এ বিষয়ে আমি খোঁজখবর নেব।"
অন্যদিকে কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাহাত উজ জামান বলেন,
"প্রকৃত কৃষকের বাইরে থেকে ধান সংগ্রহের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের অধিকার নিশ্চিত করা হবে এবং সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা হবে।