মাহমুদ হাসান রনি, চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি:
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার নাটুদা ও নতিপোতা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী দুলালনগর-নতিপোতা গ্রামের ভৈরব নদীর ওপর নির্মিত একটি জরাজীর্ণ বাঁশের সাঁকোই এখন কয়েকটি গ্রামের মানুষের একমাত্র ভরসা। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সাঁকো পার হচ্ছেন শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ। বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ায় সাঁকোটির অবস্থা আরও নাজুক হয়ে পড়েছে। যেকোনো সময় এটি ভেঙে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুলালনগর, নতিপোতা, কালিয়াবকরি, প্রতাপপুর, গোপালপুর ও ভগীরথপুরসহ আশপাশের অন্তত ৪ থেকে ৫টি গ্রামের হাজারো মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম এই বাঁশের সাঁকো। এলাকার মানুষকে জগন্নাথপুর বাজার, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হলে এই সাঁকো ব্যবহার করতে হয়।
বিশেষ করে মহাজনপুর কলেজ ও আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য সাঁকোটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাঁকোটির বেহাল অবস্থার কারণে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করতে হচ্ছে তাদের। বর্ষাকালে নদীর পানি বৃদ্ধি ও তীব্র স্রোতের কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মোটরসাইকেল ও সাইকেল কোনো রকমে পার করা গেলেও কৃষিপণ্যবাহী যান কিংবা জরুরি প্রয়োজনে রোগীবাহী যানবাহন পারাপারের কোনো সুযোগ নেই। ফলে চুয়াডাঙ্গা, দামুড়হুদা বা মেহেরপুরের দিকে যেতে হলে হেমায়েতপুর-চারুলিয়া হয়ে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ কিলোমিটার পথ ঘুরে যেতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটোরই অপচয় হচ্ছে।
দুলালনগর গ্রামের বাসিন্দা রমজান আলী ওরফে টিটন (৪৫) বলেন, “বহু বছর ধরে আমরা এই বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভরশীল। একটি স্থায়ী সেতুর দাবি দীর্ঘদিনের হলেও এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়, যা অত্যন্ত কষ্টকর ও উদ্বেগজনক।”
একই গ্রামের পূর্বপাড়া জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা ফারুকুজ্জামান বকুল (৫৫) বলেন, “কৃষকরা মাঠ থেকে ফসল ঘরে তুলতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অতিরিক্ত পথ ঘুরে যেতে হওয়ায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।”
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম ও নজরুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, বিভিন্ন সময়ে সরকারি কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীরা এসে স্থান পরিদর্শন ও পরিমাপ করে গেলেও এখন পর্যন্ত সেতু নির্মাণের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।
এদিকে নিজস্ব অর্থায়নে সাঁকোটি নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় ইজারাদার নাজমুল হোসেন জানান, সাঁকোটি নির্মাণে প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এছাড়া প্রতি বছর মেরামত ও সংস্কারে আরও ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু পারাপারকারীদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত টোল আদায় না হওয়ায় খরচের তুলনায় আয় খুবই কম। ফলে নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, “এবার বর্ষা মৌসুমে সাঁকোটির অবস্থা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। নদীর স্রোত বেড়ে গেলে যেকোনো সময় এটি ভেসে যেতে পারে। তখন এলাকার মানুষের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।”
এ বিষয়ে দামুড়হুদা উপজেলা প্রকৌশলী খালিদ হাসান বলেন, “সাঁকোটির বর্তমান অবস্থা আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
এলাকাবাসীর দাবি, জনদুর্ভোগ লাঘব, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত এবং এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে ভৈরব নদীর ওপর দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হোক। অন্যথায় বর্ষা মৌসুমে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।