মকবুল হোসেন
ময়মনসিংহ জেলা প্রতিনিধি
"দুগ্ধ উৎপাদনে নারী খামারি, উন্নয়নের অগ্রযাত্রা"—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ময়মনসিংহে যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়েছে বিশ্ব দুগ্ধ দিবস ২০২৬। দিবসটি উপলক্ষে সোমবার (১ জুন) জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনা সভা এবং দুগ্ধ খাতের উন্নয়ন ও সম্ভাবনা বিষয়ক নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
সকালে জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের হয়। র্যালিটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে এসে শেষ হয়। র্যালিতে প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, ভেটেরিনারি সার্জন, খামারি প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন।
র্যালি শেষে জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সভাকক্ষে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ডা. মনোরঞ্জন ধর। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ওয়াহেদুল আলম।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. মনোরঞ্জন ধর বলেন, দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দুগ্ধ খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে দেশের দুগ্ধ শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এ খাতকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করে তুলছে। তিনি বলেন, নারীরা শুধু পারিবারিক পর্যায়েই নয়, বাণিজ্যিক খামার ব্যবস্থাপনাতেও দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। ফলে দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নও নিশ্চিত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, নিরাপদ ও মানসম্মত দুধ উৎপাদনের জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত জাতের গবাদিপশু পালন, সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে খামারিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ওয়াহেদুল আলম বলেন, দুগ্ধ খামার বর্তমানে নারীর ক্ষমতায়ন ও পারিবারিক আর্থিক উন্নয়নের একটি কার্যকর ও সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, কৃত্রিম প্রজনন সেবা, চিকিৎসা সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত পরামর্শের মাধ্যমে নারী খামারিদের দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্বাবলম্বী করে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, গ্রামীণ পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের উন্নয়নে সরকার নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধি, পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে আত্মনির্ভরশীল দুগ্ধ খাত গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, নিরাপদ দুধ উৎপাদন নিশ্চিত করা, দুগ্ধজাত পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখা, খামারিদের দক্ষতা উন্নয়ন, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের দুগ্ধ খাতকে আরও এগিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টেকসই খামার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
বক্তারা আরও বলেন, বিশ্ব দুগ্ধ দিবস শুধু দুগ্ধ শিল্পের গুরুত্ব তুলে ধরার একটি উপলক্ষ নয়, বরং দেশের পুষ্টি, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে দুগ্ধ খাতের অবদান সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এজন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা, খামারি ও ভোক্তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি নিরাপদ, আধুনিক ও টেকসই দুগ্ধ খাত গড়ে তুলতে হবে।
অনুষ্ঠানে জেলার বিভিন্ন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, ভেটেরিনারি সার্জন, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। দিবসটির বিভিন্ন কর্মসূচিতে নারী খামারিদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, যা দেশের দুগ্ধ খাতের উন্নয়নে তাদের ক্রমবর্ধমান ভূমিকারই প্রতিফলন।