জামালপুর প্রতিনিধি:
জামালপুরে একই দিনে পৃথক দুই জলদুর্ঘটনায় এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু এবং এক কিশোরের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঈদুল আজহার ছুটির আনন্দ মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হয়েছে দুই পরিবারের জন্য। শনিবার (৩০ মে) দুপুরে জেলার মাদারগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় এ দুটি দুর্ঘটনা ঘটে।
জানা যায়, মাদারগঞ্জ উপজেলার কড়ইচড়া ইউনিয়নের ঘুঘুমারি পূর্বপাড়া এলাকায় পুকুরের পানিতে ডুবে আলিফ (১১) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নিহত আলিফ ওই এলাকার কাশেম মন্ডলের ছেলে এবং স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঈদের ছুটিতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল আলিফ। শনিবার দুপুরে বাড়ির পাশের একটি পুকুরে সমবয়সী কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে গোসল করতে যায় সে। খেলাধুলা ও গোসলের একপর্যায়ে সাঁতার না জানার কারণে আলিফ গভীর পানিতে চলে যায় এবং হঠাৎ তলিয়ে যায়।
প্রথমে বিষয়টি কেউ বুঝতে না পারলেও কিছুক্ষণ পর তাকে দেখতে না পেয়ে অন্য শিশুরা চিৎকার শুরু করে। পরে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে এসে পুকুরে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী অনুসন্ধানের পর স্থানীয়রা জাল ফেলে তাকে উদ্ধার করেন। উদ্ধার করে দ্রুত মাদারগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আলিফের মৃত্যুর খবরে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শোকের মাতম শুরু হয়। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। প্রতিবেশীরা জানান, আলিফ ছিল অত্যন্ত শান্ত ও মেধাবী একটি শিশু। ঈদের আগে তার এমন মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না।
মাদারগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. আবু রায়হান বলেন, “শিশুটিকে হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল। আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিষয়টি নিশ্চিত করেছি।”
মাদারগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) স্নেহাশীষ রায় ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।
অন্যদিকে একই দিনে জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চরআমখাওয়া ইউনিয়নের সানন্দবাড়ী মন্ডলপাড়া এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদে গোসল করতে নেমে শাওন (১৫) নামে এক কিশোর নিখোঁজ হয়েছে। নিখোঁজ শাওন উপজেলার ৩ নম্বর পাররামরামপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ মোয়ামারী গ্রামের মো. সাইদুর রহমানের ছেলে এবং ঢাকার মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল শাওন। শনিবার দুপুরে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র নদে গোসল করতে যায় সে। নদীতে নামার কিছুক্ষণ পর হঠাৎ প্রবল স্রোতের কবলে পড়ে শাওন। একপর্যায়ে সে পানির নিচে তলিয়ে যায় এবং আর ভেসে ওঠেনি।
বন্ধুরা বিষয়টি টের পেয়ে দ্রুত স্থানীয় বাসিন্দাদের খবর দেয়। পরে এলাকাবাসী নদীতে নেমে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। খবর পেয়ে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন।
ফায়ার সার্ভিসের একটি ডুবুরি দল নদীর বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান চালালেও সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত শাওনের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয়দের মতে, বর্ষা মৌসুমের শুরুতে ব্রহ্মপুত্র নদে স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় নদীতে গোসল করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কিশোর-তরুণদের মধ্যে নদীতে সাঁতার ও গোসলের প্রবণতা থাকলেও নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে।
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, “নিখোঁজ কিশোরকে উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা যৌথভাবে অনুসন্ধান করছেন। পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।”
একই দিনে জেলার দুই উপজেলায় ঘটে যাওয়া এ দুটি জলদুর্ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু ও কিশোরদের একা পুকুর, নদী কিংবা জলাশয়ে যেতে না দেওয়া, সাঁতার শেখানো এবং অভিভাবকদের বাড়তি নজরদারি বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে ঈদ ও অন্যান্য ছুটির সময়ে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার ও সমাজের সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে।
ঈদের আনন্দের প্রাক্কালে আলিফের মৃত্যু এবং শাওনের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় জামালপুরজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একদিকে একটি পরিবার তাদের সন্তানকে চিরতরে হারিয়েছে, অন্যদিকে আরেকটি পরিবার এখনো অপেক্ষা করছে প্রিয় সন্তানের সন্ধানের জন্য।