ফিরোজ আল আমিন
নিজস্ব প্রতিনিধি:
মহান আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসকে সামনে রেখে যখন বিশ্বজুড়ে শ্রমিকের অধিকার নিয়ে উচ্চকণ্ঠ আলোচনা চলছে, তখন সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলাসহ চলন বিলাঞ্চলের নারী শ্রমিকদের বাস্তবতা যেন এক নীরব বৈপরীত্য। সমান শ্রম দিয়েও শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে তারা প্রতিনিয়ত মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
এক সময় ঘরকেন্দ্রিক জীবনে সীমাবদ্ধ থাকা এই নারীরাই এখন কৃষি, ইটভাটা, সড়ক নির্মাণ, মাটি কাটা, মালামাল বহন, চাতাল ও রাজমিস্ত্রির জোগালিসহ নানা কষ্টসাধ্য কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। ভোরের আলো ফোটার আগেই কাজ শুরু করে সন্ধ্যার আঁধার নামা পর্যন্ত টানা পরিশ্রম করেও ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তাড়াশের বিভিন্ন এলাকায় পুরুষ শ্রমিকরা যেখানে দৈনিক ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা মজুরি পান, সেখানে একই কাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের দেওয়া হয় মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতিদিনই ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত কম পাচ্ছেন নারীরা—যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের জীবনে বড় ধরনের আর্থিক বৈষম্য তৈরি করছে।
চলতি বোরো মৌসুমে তীব্র দাবদাহ উপেক্ষা করে মাঠে ধান কাটা, শুকানো ও বহনের কাজে নারীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে সেখানেও মজুরির ক্ষেত্রে বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট।
স্থানীয় নারী শ্রমিক সূর্য বেগম ক্ষোভের সঙ্গে বলেন,
“রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে আমরা পুরুষদের মতোই কাজ করি। কিন্তু তারা ৭০০-৮০০ টাকা পেলেও আমাদের দেওয়া হয় মাত্র ৪০০-৫০০ টাকা। নারী বলেই আমাদের শ্রমের মূল্য কম।”
ইটভাটায় কর্মরত নারীদের অবস্থাও একই রকম। ভাটারপাড়া এলাকার শ্রমিক সালমা খাতুন বলেন,
“দিনভর কঠোর পরিশ্রমের পরও পুরুষরা ৭০০ টাকা পায়, আমরা পাই ৪০০ টাকা। অথচ কাজে কোনো পার্থক্য নেই।”
অন্যদিকে, অনেক নারী শ্রমিক দিনে মাত্র ৩৫০ টাকা মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। সংসারের অভাব, ঋণের চাপ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে তারা এই অল্প আয়েই জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে এই অন্ধকারের মাঝেও কিছুটা আলোর রেখা দেখা গেছে। উপজেলার মাধাইনগর ইউনিয়নের কালীবাড়ি এলাকার একটি ইটভাটায় ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন মালিক মো. আব্দুর রহমান। তিনি জানান, তার প্রতিষ্ঠানে নারী-পুরুষ ভেদে কোনো মজুরি বৈষম্য নেই; সমান কাজের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করা হয়।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, নারীদের এই দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করতে হলে কার্যকর নজরদারি ও শ্রম আইন বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আসন্ন শ্রমিক দিবসকে ঘিরে নারী শ্রমিকদের একটাই প্রত্যাশা—“সমান কাজের জন্য সমান মজুরি”।
এই দাবির বাস্তবায়নই হতে পারে শ্রমিক দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য।