সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
সিরাজগঞ্জ জেলায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হামের সংক্রমণ। দিন দিন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে স্বাস্থ্য বিভাগসহ সাধারণ মানুষের মধ্যেও। জেলার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ইতোমধ্যে ৮শ ছাড়িয়েছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, জেলায় হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮১৪ জনে। আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু হলেও বিভিন্ন বয়সী মানুষও এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পরিসংখ্যানবিদ মো. হুমায়ুন কবির এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে যে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে জেলায় হামের সংক্রমণ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এ রোগের বিস্তার বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রকাশিত হামে রোগী ভর্তির দৈনিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শনিবার (৩০ মে) শেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৩২ জন রোগী হামের লক্ষণ নিয়ে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৫ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭ জন। নতুন রোগী যুক্ত হওয়ায় মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮১৪ জনে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ৭৫৬ জন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ৫৮ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। যদিও অধিকাংশ রোগীর অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানা গেছে, তবে শিশুদের ক্ষেত্রে জটিলতা এড়াতে চিকিৎসকরা বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করছেন।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ১৭ মে পর্যন্ত জেলায় হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৬০০ জন। অর্থাৎ মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে আরও ২১৪ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি স্বাস্থ্য বিভাগকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে আগামী দিনগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
বর্তমানে আক্রান্ত রোগীদের সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, খাজা ইউনূস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং জেলার বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রোগীর চাপ বাড়লেও হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে খুব দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত প্রথম দিকে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং দুর্বলতা দেখা দেয়। পরবর্তীতে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা দানা দেখা যায়, যা হামের অন্যতম প্রধান লক্ষণ। শিশুদের ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা না হলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি এবং অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, হামের বিস্তার রোধে টিকাদানের কোনো বিকল্প নেই। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের নির্ধারিত সময়ে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য অভিভাবকদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানানো হয়েছে। যেসব শিশু এখনো টিকার আওতায় আসেনি, তাদের দ্রুত টিকা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং হাঁচি-কাশির সময় সতর্কতা অবলম্বন করলে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে জ্বর, সর্দি-কাশি বা শরীরে লালচে দানা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত রাখার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদের সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেলে অতিরিক্ত চিকিৎসা সুবিধা ও বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালুর প্রস্তুতিও রয়েছে।
এদিকে হামের প্রকোপ বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিকরাও। তাদের মতে, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমে এ রোগের বিস্তার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিশেষ করে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে মানুষের চলাচল ও জনসমাগম বাড়তে পারে, তাই এখন থেকেই প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। সময়মতো টিকা গ্রহণ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে এ রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। তাই অভিভাবক, স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগই পারে সিরাজগঞ্জে হামের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে।