ফিরোজ আল আমিন
নিজস্ব প্রতিনিধি:
সরকারি নথিপত্র, ভূমি রেকর্ড ও মানচিত্রে এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ সড়কের অস্তিত্ব রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেখানে এখন চোখে পড়ে শুধু সবুজ ধানক্ষেত ও বিভিন্ন ফসলের আবাদ। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা ইউনিয়নের রুদ্রপুর চাকিপাড়া থেকে সোনারাম দুক্কি মরা বটতলা পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ একটি গ্রামীণ কাঁচা সড়কের প্রায় এক কিলোমিটার অংশ সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী কিছু ভূমি মালিক সরকারি রাস্তার জমি দখল করে নিজেদের কৃষিজমির সঙ্গে একীভূত করে ফেলেছেন। ফলে কয়েকটি গ্রামের হাজারো মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রুদ্রপুর চাকিপাড়া থেকে হাবিলাগাড়ি পর্যন্ত সড়কের কিছু অংশ এখনও কোনো রকমে টিকে থাকলেও হাবিলাগাড়ি থেকে দুক্কি মরা বটতলা পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় রাস্তার কোনো অস্তিত্ব নেই। একসময় যেখানে মানুষ, গরুর গাড়ি, ভ্যান ও মোটরসাইকেল চলাচল করত, বর্তমানে সেখানে ধান, পাট ও অন্যান্য মৌসুমি ফসলের চাষাবাদ হচ্ছে। রাস্তার দুই পাশের জমির সঙ্গে মিশে যাওয়ায় নতুন করে কেউ দেখলে সেখানে কোনোদিন রাস্তা ছিল, সেটি বোঝার উপায় নেই।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এই সড়কটি শুধু একটি গ্রামের নয়, বরং রুদ্রপুর চাকিপাড়া, বাঐখোলা, সোনারামপুর, দেবরাজপুরসহ আশপাশের একাধিক গ্রামের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম ছিল। কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ, শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাতায়াত, রোগীদের দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের জন্য এই রাস্তা ছিল সবচেয়ে সহজ ও স্বল্প দূরত্বের পথ।
বর্তমানে রাস্তার একটি বড় অংশ বিলীন হয়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের কয়েক মাইল ঘুরে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ দুটোই বেশি ব্যয় হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তখন বিকল্প পথও কাদায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা নিজামুদ্দিন মণ্ডল বলেন, “আমাদের ছোটবেলা থেকে এই রাস্তা দেখে আসছি। এই পথ দিয়েই মানুষ হাটবাজার, স্কুল, মসজিদ এবং বিভিন্ন কাজে যাতায়াত করত। ধীরে ধীরে রাস্তার মাটি কেটে পাশের জমির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হয়েছে। এখন নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না এখানে কোনো রাস্তা ছিল।”
ভুক্তভোগী আব্দুস সালাম বলেন, “আগে কৃষিপণ্য সহজেই বাজারে নেওয়া যেত। এখন কয়েক কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। বর্ষাকালে অবস্থা আরও খারাপ হয়। অনেক সময় রোগী নিয়ে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া সম্ভব হয় না। প্রশাসনের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।”
একাধিক কৃষক জানান, রাস্তা না থাকায় ফসল পরিবহনে অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে। আগে যে পথ দিয়ে অল্প সময়ে জমিতে যাওয়া যেত, এখন সেখানে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন গ্রামবাসী অভিযোগ করেন, সরকারি রাস্তা দখলের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। কেউ অভিযোগ করলেও বিভিন্নভাবে চাপের মুখে পড়তে হয়। ফলে বছরের পর বছর সরকারি সম্পত্তি দখলের ঘটনা চললেও কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একটি সরকারি রাস্তা এভাবে বিলীন হয়ে যাওয়া শুধু স্থানীয় জনগণের দুর্ভোগই নয়, বরং সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় প্রশাসনিক নজরদারির দুর্বলতারও প্রমাণ। তারা দ্রুত ভূমি জরিপ করে সড়কের প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ, দখলদারদের শনাক্ত এবং রাস্তা পুনরুদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন।
চান্দাইকোনা ইউনিয়ন ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সরকারি রাস্তা বা খাসজমি ব্যক্তিগত দখলে নেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রয়োজনে সীমানা নির্ধারণের মাধ্যমে রাস্তা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
চান্দাইকোনা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. হাবিবুর রহমান খান বলেন, “সরকারি রাস্তা জনগণের সম্পদ। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সেটি দখল করতে পারে না। এলাকাবাসীর অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত সড়কটি উদ্ধার করে জনসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা উচিত।”
তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে রায়গঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আব্দুল খালেক পাটোয়ারীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিনের এই সমস্যা সমাধানে আর কোনো আশ্বাস নয়, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ। তারা দ্রুত সরকারি সড়কটি দখলমুক্ত করে পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে কয়েকটি গ্রামের মানুষের স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।