মোখলেছুর রহমান ধনু
রামগতি-কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি:
প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের এই আধুনিক যুগে যখন স্মার্টফোন মানুষের নিত্যসঙ্গী, তখন এক সময় বাংলার গ্রামীণ জনপদে তথ্য ও বিনোদনের একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম ছিল ছোট্ট একটি যন্ত্র—ফিলিপস রেডিও। সময়ের বিবর্তনে আজ তা প্রায় বিলুপ্তির পথে, তবে লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগরের মানুষের স্মৃতিতে এর আবেদন এখনো অমলিন।
একসময় উপকূলীয় রামগতি ও কমলনগরে মানুষের খবর জানার প্রধান মাধ্যম ছিল এই রেডিও। মেঘনা নদী কিংবা সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের কাছে আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়ার একমাত্র ভরসা ছিল এটি। পাশাপাশি ছায়াছবির গান, আজান কিংবা সময় জানার জন্যও মানুষ নির্ভর করত রেডিওর ওপর।
রামগতির বিবিরহাট এলাকার বাসিন্দা আবুল খায়ের জানান,“সংবাদ শোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল। বাবার একটি গরু বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে শখের রেডিওটি কিনেছিলাম।”
অন্যদিকে কমলনগরের ফজুমিয়ারহাট বাজারের ব্যবসায়ী আবুল কাশেম মিয়া এখনো সেই পুরনো অভ্যাস ধরে রেখেছেন। তিনি নিয়মিত বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদ শোনেন।
একসময় গ্রামীণ সমাজে ফিলিপস রেডিও ছিল মর্যাদা ও আভিজাত্যের প্রতীক। বিয়ের সময় নতুন জামাইয়ের হাতে একটি রেডিও থাকা ছিল গর্বের বিষয়। অনেক শৌখিন যুবক কষ্ট করে হলেও এটি সংগ্রহ করতেন।
কৃষিকাজের ফাঁকে কিংবা মেঠোপথে চলার সময় রেডিওর সুরই ছিল মানুষের বিনোদনের সঙ্গী। দোকানের সামনে বা বাড়ির উঠোনে রেডিওকে ঘিরে জমে উঠত আড্ডা—সংবাদ, গান আর গল্পে মুখর থাকত পুরো এলাকা।
ডাচ উদ্যোক্তা এন্টনি ফিলিপসের হাত ধরে ১৯৩১ সালে যাত্রা শুরু করা এই ব্র্যান্ডটি বাংলাদেশে বিশেষভাবে জনপ্রিয়তা পায় সত্তরের দশকে। ১৯৭৫ সালের পর এক ব্যান্ডের ফিলিপস রেডিওর দাম ছিল প্রায় ২৪০ টাকা।
বর্তমান প্রজন্মের কাছে রেডিও হয়তো শুধু একটি অ্যান্টিক বস্তু। কিন্তু প্রবীণদের কাছে এটি ছিল জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ—সংবাদ, বিনোদন এবং মানসিক প্রশান্তির একমাত্র মাধ্যম।
প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সেই সোনালী দিনগুলো আজ হারিয়ে গেলেও ফিলিপস রেডিওর নস্টালজিয়া এখনো বেঁচে আছে রামগতি-কমলনগরের মানুষের হৃদয়ে। একটি সরল ও সুন্দর জীবনের নীরব সাক্ষী হয়ে এই রেডিও চিরকাল জায়গা করে নেবে ইতিহাসের পাতায়।