সম্পাদকীয়
ফিরোজ আল আমিন
লেখক, সাংবাদিক
গণমাধ্যমকে দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন পোর্টাল কিংবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—সব মিলিয়ে গণমাধ্যমের মূল দায়িত্ব হলো সত্য ও নিরপেক্ষ তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক সময়ে “অপ-সাংবাদিকতা” নামক একটি নেতিবাচক প্রবণতা ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে, যা শুধু সাংবাদিকতার মর্যাদাকেই ক্ষুণ্ন করছে না, বরং সমাজের তথ্য-ব্যবস্থাকেও বিপর্যস্ত করে তুলছে।
অপ-সাংবাদিকতা বলতে মূলত এমন সব কর্মকাণ্ডকে বোঝায়, যা সাংবাদিকতার নীতিমালা, পেশাগত সততা ও বস্তুনিষ্ঠতার পরিপন্থী। এর মধ্যে রয়েছে—ভুয়া বা যাচাইবিহীন তথ্য প্রচার, গুজব ছড়ানো, ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য সংবাদ বিকৃতি, হলুদ সাংবাদিকতা (Yellow Journalism), ব্ল্যাকমেইলিং, চাঁদাবাজি, কিংবা রাজনৈতিক বা কর্পোরেট প্রভাবের কাছে নতিস্বীকার করে পক্ষপাতমূলক সংবাদ পরিবেশন। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, অদক্ষ বা প্রশিক্ষণহীন ব্যক্তিরা শুধু একটি পরিচয়পত্র বা অনলাইন পোর্টাল তৈরি করে নিজেদের ‘সাংবাদিক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন, যা পুরো পেশার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশেষ করে ডিজিটাল যুগে অপ-সাংবাদিকতার বিস্তার আরও দ্রুততর হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন ফেসবুক, ইউটিউব বা বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টাল এখন তথ্য প্রচারের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই সহজলভ্যতা যেমন ইতিবাচক দিক নিয়ে এসেছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে বড় ধরনের ঝুঁকি। যাচাই-বাছাই ছাড়া যেকোনো তথ্য মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায়, আকর্ষণীয় শিরোনাম (clickbait) দিয়ে পাঠক টানার জন্য খবরের বিষয়বস্তু বিকৃত করা হচ্ছে, বা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন খবর প্রচার করা হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে, সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে, এমনকি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটছে।
অপ-সাংবাদিকতার আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো—এটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করে। কোনো যাচাই ছাড়া কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে সংবাদ প্রকাশ করা হলে, পরবর্তীতে তা মিথ্যা প্রমাণিত হলেও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্মান পুরোপুরি ফিরে পাওয়া যায় না। অনেক সময় এই ধরনের সংবাদ ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা বা অর্থনৈতিক লাভের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হয়, যা নৈতিকভাবে যেমন অগ্রহণযোগ্য, তেমনি আইনগতভাবেও অপরাধ।
এ প্রবণতার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষের আস্থা। গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের বিশ্বাসই হলো এর সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু যখন বারবার ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর সংবাদ চোখে পড়ে, তখন মানুষ পুরো মিডিয়াকেই অবিশ্বাস করতে শুরু করে। ফলে প্রকৃত, গুরুত্বপূর্ণ ও অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতাও গুরুত্ব হারাতে বসে। এটি একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য গভীর হুমকি—কারণ তথ্যের ওপর আস্থা না থাকলে সচেতন নাগরিক তৈরি হয় না।
অপ-সাংবাদিকতার পেছনে কিছু কাঠামোগত কারণও রয়েছে। প্রথমত, গণমাধ্যমের অপ্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার—অর্থাৎ যত্রতত্র অনলাইন পোর্টাল তৈরি হওয়া, যার কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। দ্বিতীয়ত, পেশাগত প্রশিক্ষণ ও নৈতিক শিক্ষার অভাব। তৃতীয়ত, আর্থিক অনিশ্চয়তা—অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক না পাওয়ায় বিকল্প অনৈতিক পথে ঝুঁকে পড়েন। চতুর্থত, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের চাপ, যা নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পথে বড় বাধা।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। প্রথমত, সাংবাদিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও আচরণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রতিটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে, যাতে ভুল বা বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশের আগেই তা প্রতিরোধ করা যায়। দ্বিতীয়ত, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভুয়া বা অপ-সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, তবে তা যেন কখনোই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব না করে—সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে।
তৃতীয়ত, সাংবাদিকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক সাংবাদিকতায় তথ্য যাচাই (fact-checking), ডেটা জার্নালিজম, নৈতিকতা—এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। চতুর্থত, গণমাধ্যম মালিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে—সাংবাদিকদের যথাযথ সম্মানী ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, যাতে তারা চাপমুক্ত হয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
সবশেষে, সাধারণ জনগণের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিত কোনো সংবাদ দেখলেই তা যাচাই না করে বিশ্বাস বা শেয়ার না করা। নির্ভরযোগ্য উৎস অনুসরণ করা এবং ভুয়া তথ্য শনাক্ত করার দক্ষতা অর্জন করা এখন সময়ের দাবি।
সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব, একটি নৈতিক অঙ্গীকার। অপ-সাংবাদিকতা সেই অঙ্গীকারকে ভঙ্গ করে, সমাজকে বিভ্রান্তির অন্ধকারে ঠেলে দেয়। তাই আজ প্রয়োজন—সত্য, ন্যায় ও বস্তুনিষ্ঠতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমরা অপ-সাংবাদিকতার এই অশুভ প্রবণতা রোধ করতে পারি এবং একটি সুস্থ, দায়িত্বশীল ও বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হবো।