ফিরোজ আল আমিন
নিজস্ব প্রতিনিধি:
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বারুহাঁস গ্রামে প্রায় দেড়শ বছরের ঐতিহ্য বহন করে চলছে ‘বউ মেলা’। ভাদাই মেলার পরদিন অনুষ্ঠিত এই ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজনটি প্রতি বছরই এলাকার নারীদের জন্য এক অনন্য উৎসবে পরিণত হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার পূর্ণিমার রাতে বসে ঐতিহ্যবাহী ভাদাই মেলা এবং পরদিন শনিবার সকাল থেকে শুরু হয় বহুল প্রতীক্ষিত ‘বউ মেলা’। মূলত নারীদের জন্য উন্মুক্ত এ মেলায় মা, শাশুড়ি, স্ত্রী, কন্যাসহ সব বয়সী নারীরা দলবেঁধে অংশগ্রহণ করেন। ফলে এটি শুধুমাত্র কেনাকাটার স্থান নয়, বরং আত্মীয়তা ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার এক মিলনমেলায় রূপ নেয়।
শুধু বারুহাঁস গ্রাম নয়, তাড়াশ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও পাশের নাটোর জেলার সিংড়া ও গুরুদাসপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী ২০ থেকে ২৫টি গ্রামের নারী, কিশোরী ও শিক্ষার্থীরা এ মেলায় অংশ নিতে ভিড় জমান। সকাল থেকেই মেলা প্রাঙ্গণে নারীদের সরব উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
মেলায় বিভিন্ন ধরনের পণ্যের সমারোহ লক্ষ্য করা যায়। নামী-দামী ব্র্যান্ডের কসমেটিকস সামগ্রীর পাশাপাশি স্বল্পমূল্যের প্রসাধনী, নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহস্থালী সামগ্রী, কাঠের তৈরি আসবাবপত্র, বাঁশ-বেতের পণ্য, লৌহজাত সরঞ্জাম, মৃৎশিল্প এবং হরেক রকম মিঠাই-মিষ্টান্নে ভরপুর থাকে দোকানপাট। ফলে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্যই মেলাটি হয়ে ওঠে আকর্ষণীয়।
বিনোদনের দিক থেকেও মেলাটি পিছিয়ে নেই। নাগরদোলা, জাদু প্রদর্শনী ও পুতুল নাচসহ নানা আয়োজন ছোট-বড় সবার মন কেড়ে নেয়। মেলায় আগতরা কেনাকাটার পাশাপাশি এসব বিনোদন উপভোগ করেন এবং ঐতিহ্যবাহী রসগোল্লাসহ বিভিন্ন মুখরোচক খাবারের স্বাদ নেন।
মেলায় আসা সিংড়া উপজেলার বিয়াস গ্রামের কিশোরী শীলা পারভীন বলেন, “প্রতিবছরই এই মেলায় আসার জন্য অপেক্ষা করি। এখানে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো, নাগরদোলায় চড়া আর মেলার মিষ্টি খাওয়ার আলাদা আনন্দ আছে।”
অন্যদিকে, বয়স্ক নারীদের অনেকেই বাঁশ, বেত ও কাঠের তৈরি গৃহস্থালী সামগ্রী এবং দা-বটির মতো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে দেখা গেছে, যা গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে এই মেলার গভীর সম্পর্ককে তুলে ধরে।
মেলার আয়োজক কমিটির সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম জানান, “এই বউ মেলা আমাদের এলাকার একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। প্রতি বছরই আশপাশের গ্রামের নারীরা এখানে এসে স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটা করেন। আমরা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখছি।”
সব মিলিয়ে, দেড় শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী বারুহাঁসের ‘বউ মেলা’ শুধু একটি বাণিজ্যিক আয়োজন নয়, বরং এটি গ্রামীণ সংস্কৃতি, নারীসমাজের অংশগ্রহণ এবং সামাজিক বন্ধনের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।