ফিরোজ আল আমিন
নিজস্ব প্রতিনিধি:
এক সময়ের প্রমত্তা যমুনা এখন যেন ধুধু বালুচর। যে নদীর ঢেউয়ের গর্জনে একসময় জনপদ কাঁপত, সেই নদীর বুকে এখন শোভা পাচ্ছে ইরি-বোরোসহ হরেক রকমের ফসল। নাব্যতা হারিয়ে সিরাজগঞ্জের যমুনার গতিপথ বদলে যাওয়ায় চরাঞ্চলবাসীর অর্থনীতিতে আসছে আমূল পরিবর্তন। জেলেরা পেশা বদলে কৃষিতে ঝুঁকলেও, নদী তার চিরচেনা রূপ ও জীববৈচিত্র্য হারানোয় জনমনে সৃষ্টি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
সরেজমিনে দেখা যায়, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, বেলকুচি, কাজিপুর, চৌহালী ও সদর উপজেলার যমুনা তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন শুধুই চর আর চর। কয়েক যুগ আগের সেই ভয়াবহ ভাঙন এখন অনেকটাই স্তিমিত। যমুনা সেতুর উত্তর ও দক্ষিণ পাশে জেগে ওঠা এসব চরে এখন আর বালু উড়ে না, বরং সেখানে দোল খাচ্ছে বোরো ধান, তিল, কাউন, বাদাম, গম ও মসুরসহ বিভিন্ন রবি শস্য।চরের জমিতে চাষাবাদে খরচ তুলনামূলক অনেক কম।পলি পড়া উর্বর মাটিতে ফলন ভালো হওয়ায় লাভের মুখ দেখছেন তারা।নদীর তলদেশ জেগে ওঠায় সেখানে বড় বড় গরু-মহিষের খামার গড়ে উঠেছে।নদীর এই পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মৎস্য সম্পদ। যমুনার বিখ্যাত ইলিশ, চিংড়ি, বোয়াল ও পাবদা মাছ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। ফলে দীর্ঘদিনের পৈতৃক পেশা ছেড়ে জেলেরা এখন দিনমজুর বা কৃষক হিসেবে কাজ করছেন। যমুনার তলদেশ ভরাট হওয়ায় নৌ-চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, ফলে চরবাসীকে যাতায়াতে পোহাতে হচ্ছে সীমাহীন দুর্ভোগ।
স্থানীয় এক প্রবীণ মাঝির আক্ষেপ, "যেখানে একসময় বড় বড় ফেরি ভিড়ত, সেখানে এখন গরু বাঁধা থাকে। স্রোতের ভয়ে একসময় হাল ধরতে কাঁপতাম, আর এখন মাইলের পর মাইল হেঁটে পার হতে হয়।"
বিশিষ্টজনদের মতে, যমুনা সেতু নির্মাণের পর থেকেই নদীর প্রবাহে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে মূল চ্যানেলগুলো। কৃষিবিদরা এই পরিবর্তনকে অর্থনৈতিকভাবে ইতিবাচক দেখলেও পরিবেশবিদরা নদীর অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তিত।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান জানান:"যমুনার গতিপথ পরিবর্তনের কারণেই মূলত এই নাব্যতা সংকট দেখা দিয়েছে। ইতিপূর্বে বিভিন্ন চ্যানেলে ড্রেজিং করে প্রবাহ সচল করার চেষ্টা করা হয়েছিল। নিয়মিত ও সুপরিকল্পিত ড্রেজিং করা গেলে যমুনাকে আবার তার স্বাভাবিক রূপে ফেরানো সম্ভব।"